এলোমেলো শার্ট

“বাবা তুই একটি প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার তুই এভাবে যে যাস কেও কিছু বলেনা?” ” তোর চলাফেরা এমন কেন? তুই শার্ট ইন করিস না কেন? shave করিস না কেন নিয়মিত? ” “তোর বস তোকে কিছু বলেনা? তুই বুঝিস না কেন তোর পরিচয় তোর পোশাকেই?”একটাই উত্তর “মা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার দের অফিসিয়াল পোশাক থাকেনা আমার বস ও আমার মতই”।

আমার আমার মা সবসময় পোশাক সচেতন, সবসময় ম্যাচ করে শাড়ি, চশমা, ঘড়ি পড়েন। জেনেটিক্যালি তাঁর এই গুনটি আমি ইনহেরিট করিনি। আমাকে নিয়ে আমার পরিবারের আফসোসের শেষ নেই।পোশাকী স্মার্টনেস নিয়ে আমি কখনো টেন্সিত ছিলাম না, পোশাকের চেয়ে নিজের আভ্যন্তরীন স্বত্বাকেই সবসময় প্রাধান্য দিয়েছি। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সবসময় প্রাউড ফিল করতাম, পোশাক আশাক সবসময় আমার মাথার উপর দিয়ে যেত। আমার বস ছিলেন কার্তিক বালাসুভ্রমনিয়ম নামের একজন তামিল, শিল্পপতি বাবার ছোট ছেলে, অসম্ভব মেধাবী, আমেরিকা থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পরে আসা এই তরুণকে কখনো পোশাকী স্মার্টনেস এর ধার ধারতে দেখিনি, বেশ ভাল লাগতো। আমার সাথে সবসময় তাঁর আইডিয়া শেয়ার করতেন।

মা সবসময় বলতেন “তুই যেমন তোর বস ও তেমন- যখন সময় আসবে তখন বুঝবি” , আমি শুধু হাসতাম। এই আমি তো বেশ আছি। যাই হোক এরপর দুটো সরকারী ব্যাঙ্কে চাকরী করেছি, পোশাককে গুরুত্ব দিইনি কখনো। টিশার্ট, নরমাল প্যান্ট ( জিন্স আমার কখনো পছন্দের ছিলনা) আর সু। এতেই সবসময় কমফোর্ট ফিল করেছি।পোশাকের কারনে যে অবমূল্যায়িত হয়নি তাও নই। কিন্ত “এই আমি তো বেশ আছি” এই তত্ত্বে চলেছি।

বাংলাদেশ ব্যাংকে জয়েন করার পর মোটামুটি শার্ট ইন করছি নিতান্তই বাধ্য হয়ে। সবসময় আমি নিতান্তি অলস প্রকৃতির। আমার খুব কম শার্ট আমি নিজে কিনেছি। যাই হোক বাংলাদেশ ব্যাংকে জয়েন করার পর মা আমাকে দুটো শার্ট উপহার দিলেন। শার্ট দুটো সুন্দর, আমি দাম জিজ্ঞেস করলাম, মা কিছুতেই দাম বলবেন না। অনেক জোরাজুরি করার পর মা দাম বললেন। আমি তো দাম শুনে তাজ্জব, দুটো শার্টের পিছন৫০০০ টাকা খরচ করার কোন যুক্তি আমার কাছে ছিলনা।রাগ হলো মার উপর। আমার মন মানসিকতা বুঝতে পেরে মা বললেন ” ঈস্বরের আশীর্বাদে তুই অনেক ইনকাম করেছিস এবার নিজের দিকে একটু নজর দে, তোর হেড অফিসে পোস্টিং ওখানে আনস্মার্ট ভাবে যাবিনা।”
আমি রাগ করে বললাম “ইনকাম করছি বলে কি অপচয় ও করতে হবে?”অনিচ্ছা সত্তেও মাকে আরো কিছু টাকা দিলাম আরো দুতিনটি শার্ট কেনার জন্য। কিন্ত আমার টাকা দিয়ে কেনা শার্ট গুলো সুতির শার্ট হওয়ায় আমি একটু বিপদেই পড়লাম।


আমাদের ফরিদাবাদ কলোনীর ইস্ত্রির দোকানদার শার্ট গুলোকে আদর করেন নাকি ইস্ত্রি করেন তাই বুঝা যায়না, শার্ট গুলোতে ইস্ত্রি-ই থাকেনা। শার্ট গুলোকে মাড় দিয়ে পড়তে বললেন মা। শার্ট ধোয়া এমনিতেই বিরক্তিকর, তাঁর উপর মাড় আরো বেশী বিরক্তিকর আর আমার রুমে সেই স্কোপ ও নেই, তবে ভাগ্য ভাল দিদির কাছ থেকে পাওয়া লিকুইড মাড় সেই সমস্যা সমাধান করতে পারবে বলে মনে হয়ে।

গতকাল অফিস থেকে সায়েদাবাদ গেলাম, চট্রগ্রাম এ আসবো। মোবাইলে টাকা ছিলনা, এক দোকানে ঢুকলাম টাকা রিচার্জ করব, দোকানের দেয়ালে গ্লাস লাগানো ছিল। শার্টের ইন ঠিক আছে কিনা চেক করে দেখছিলাম। হঠাত নিজের কাছে নিজেকেই অচেনা মনে হল। ইস্ত্রি ভাঙ্গা শার্ট, খোচা খোচা দাড়ি, নিজেকে খারাপ লাগছিল খুব।অথচ এই খারাপ লাগা ফিলিংসটা আগে কখনো লাগেনি, এই অনুভূতির কোন যুক্তি খুজে পেলাম না। ভাবছিলাম নিজের পোশাক আশাক যা আমি আগে কখনো গুরুত্ব দিইনি, হঠাত তাই কেন খারাপ লাগা আরম্ভ করছে।
শেখ সাদীর মতই এবার শার্ট প্যান্ট কে মিষ্টি খাওয়াবো ভাবছি। পোশাকী খাতে খরচ সবসময় আমার কাছে অযৌক্তিক মনে হয়েছে, নিজের কাজকেই প্রাধান্য দিয়েছি বেশী । আমি এখন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার নই, পরিবর্তিত পরিবেশ-ই কি আমাকে বদলাতে চাইছে?

মাথায় ঢুকছেনা কিছু। শুধু নিজের ভিতর থেকে কে যেন বলছে “খরচ কর ওম এবার নিজেকে দেখ একটু চেঞ্জ হও”।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: